‘বেতন বৈষম্য’ নিরসনের দাবিতে শিক্ষকদের অনশন অব্যহত
ডিটেকটিভ নিউজ ডেস্ক

‘বেতন বৈষম্য’ নিরসনের দাবিতে ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের প্রাথমিকের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকদের ‘আমরণ’ অনশন কর্মসূচি অব্যহত রয়েছে। দ্বিতীয় দিন গতকাল রোববার প্রাথমিক সরকারি শিক্ষক মহাজোটের ব্যানারে এই কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া দশ জন শিক্ষক অসুস্থ হয়ে পড়েছেন বলে আন্দোলনকারীরা জানিয়েছেন। গত শনিবার সকাল সাড়ে ১০টায় এই অনশন কর্মসূচি শুরুর পর থেকে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণেই আছেন তারা। শিক্ষক মহাজোটের নেতারা বলছেন, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত তাদের এই অনশন চলবে। অসুস্থ শিক্ষক সিদ্দিকুর রহমান, আবু তালেব, সালেহা আক্তার মুক্তা, রফিকুল ইসলাম, আবদুর রহিম, এখলাসুর রহমান, ফিরোজ আলম, মো. আলাউদ্দিনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। জাতীয় প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতি ও বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমাজ নামে তিনটি সংগঠনসহ সম্মিলিতভাবে বাংলাদেশ প্রাথমিক সরকারি শিক্ষক মহাজোট ব্যানারে এই কর্মসূচির আয়োজন করে শিক্ষকরা। জাতীয় প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক ফাউন্ডেশনের সভাপতি শাহীনুর আকতার বলেন, প্রাথমিক শিক্ষকদের মধ্যে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষক এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের বেতন বৈষম্য আছে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকদের বেতন গ্রেড প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের পরের ধাপে নির্ধারণের দাবিতে আমাদের এই আন্দোলন। গত সাড়ে তিন বছর আন্দোলন করেও সমাধান না পাওয়ায় আমরা অনশনে বসেছি। বাংলাদেশ প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক সমাজের সভাপতি মো. আনিসুর রহমান বলেন, শিক্ষাগত যোগ্যতা এক হওয়ার পরও প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক এবং প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকদের ‘বেতনে বৈষম্য’ রয়েছে। ১৯৭৩ সালে থেকে ১৯৮৪ সাল পর্যন্ত এটা ছিল না। এরপর থেকে ১৯৮৫ সালে এক ধাপ, ২০০৬ সালে দুই ধাপ এবং ২০১৪ সালে থেকে তিন ধাপের পার্থক্য তৈরি করা হয়েছে। এখন প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বেতন পাচ্ছেন একাদশ গ্রেডে। আর আমাদের দেওয়া হচ্ছে চতুর্দশ গ্রেড। বর্তমান নিয়মে একজন প্রধান শিক্ষক বেতন স্কেলের দ্বাদশ গ্রেডে চাকরি শুরু করেন। আর সহকারী শিক্ষকরা সেই স্কেলে চাকরি শেষ করবেন। অর্থ্যাৎ ১৬ বছর চাকরি করার পর সহকারী শিক্ষকরা পাবে দ্বাদশ গ্রেডে ১১ হাজার ৩০০ টাকা, এটা অমানিবক। আনিসুর বলেন, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের পরের ধাপ, অর্থাৎ দ্বাদশ গ্রেডে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সহকারী শিক্ষকদের বেতন কাঠামো নির্ধারণের দাবিতে এই আমরণ অনশন কমর্সূচি তারা চালিয়ে যাবেন। উল্লেখ্য, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়োগের যোগ্যতা এক হলেও বেতন বৈষম্যে প্রধান শিক্ষকদের চেয়ে তিন ধাপ পিছিয়ে সহকারী শিক্ষকরা। নতুন স্কেল অনুযায়ী প্রধান শিক্ষকদের দশম গ্রেড দেওয়া হলে সহকারী শিক্ষকদের সাথে ব্যবধান বেড়ে দাঁড়াবে ৪ ধাপ। দীর্ঘদিন ধরে সহকারী শিক্ষকরা তাই গ্রেড ব্যবধান ১ ধাপ কমিয়ে ১১তম গ্রেডে বেতন স্কেল করার দাবিতে আন্দোলন করছেন। প্রাথমিক শিক্ষকদের বেতন স্কেল অনুযায়ী, একজন প্রধান শিক্ষক প্রথম যোগদান করে ১২তম গ্রেডে পান ১১ হাজার ৩০০ টাকা। অন্যদিকে সহকারী শিক্ষকরা পান ১৫তম গ্রেডে ৯ হাজার ৭০০ টাকা। প্রশিক্ষণ শেষে প্রধান শিক্ষক ১১তম গ্রেডে ১২ হাজার ৫০০ টাকা পান অপরদিকে সহকারী শিক্ষক পান ১৪তম গ্রেডে ১০ হাজার ২০০ টাকা। শিক্ষকতার ১০ বছর পূর্ণ হলে প্রধান শিক্ষক ১০তম গ্রেডে ১৬ হাজার টাকা পান আর সহকারী শিক্ষক পান ১৩তম গ্রেডে ১১ হাজার টাকা। ১৬ বছর পূর্তিতে প্রধান শিক্ষক ৯ম গ্রেডে পান ২২ হাজার টাকা সেখানে সহকারী শিক্ষক পান ১২তম গ্রেডে ১১ হাজার ৩০০ টাকা। সহকারী শিক্ষকরা মনে করেন, একজন প্রধান শিক্ষক যে স্কেলে চাকরি শুরু করেন একজন সহকারী শিক্ষক ষোল বছর শেষে সেই স্কেলে চাকরি শেষ করবেন এটা অমানবিক। জানা যায়, প্রাথমিক শিক্ষকদের জন্য বেতন স্কেল চালু হয় ১৯৭৩ সাল থেকে। তখন থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের বেতনের গ্রেড ছিল সমান। ১৯৯১ সালে এসে প্রধান শিক্ষকদের সহকারী শিক্ষকদের চেয়ে বেতনের গ্রেড ১ ধাপ বাড়ানো হয়। যা ২০০৫ সাল পর্যন্ত কার্যকর ছিল। ২০০৬ সালে বেতনের গ্রেড ২ ধাপ বাড়ানো হয়। এটা কার্যকর থাকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত। সর্বশেষ ২০১৫ সালে বেতনের গ্রেড ১ ধাপ বাড়ানো হলে প্রধান শিক্ষকদের সাথে বেতনের গ্রেড ব্যবধানে তিন ধাপ পিছিয়ে যায় সহকারী শিক্ষকরা। জাতীয় প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক আমিনুল হক ভূইয়া বলেন, ১৯৭৩ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত কার্যকর স্কেলের বাস্তবায়ন করতে হবে। যেখানে প্রধান শিক্ষকদের সাথে আমাদের বেতনের গ্রেড ব্যবধান ১ থাকবে অর্থাৎ তারা দশম গ্রেডে আর আমরা ১১তম গ্রেডে বেতন বাস্তবায়ন চাই। সহকারী শিক্ষকদের বেশিরভাগকে পদোন্নতি বঞ্চিত হয়ে শিক্ষকতা জীবন শেষ করতে হয় উল্লেখ করে বাংলাদেশ প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক সমাজের সভাপতি তপন কুমার মন্ডল বলেন, বাংলাদেশে প্রধান শিক্ষকের পদ আছে ৬৩ হাজার। আর সহকারী শিক্ষকের পদ আছে সাড়ে তিন লাখ। এদের মধ্যে ১১ ভাগ শিক্ষক স্ববেতনে পদোন্নতি পান। বাকি শিক্ষকদের সহকারী হিসেবেই অবসর নিতে হয়। বেতনের এই ব্যবধান সহকারী শিক্ষকদের আর্থিক এবং সামাজিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ শামছুদ্দীন মাসুদ বলেন, প্রধান শিক্ষকদের জন্য দশম গ্রেড বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তাবনা দিয়েছে মন্ত্রণালয়। কিন্তু আমাদের জন্য কোনো কিছু করা হয়নি।